শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
নারায়ণগঞ্জে কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিল ছাত্র মজলিস নারায়ণগঞ্জের নতুন সিভিল সার্জনের সঙ্গে ক্লিনিক মালিক সমিতির মতবিনিময়: স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের আহ্বান প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদকে নারায়ণগঞ্জের তদারকির দায়িত্ব প্রদান: ডা. মজিবুর রহমানের অভিনন্দন শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিতকারীদের আইনের আওতায় এনে শান্তিপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ গড়তে কাজ করছে জেলা পুলিশ : এসপি  প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদকে নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব পাওয়ায় মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা দুলাল হোসেনের অভিনন্দন সিদ্ধিরগঞ্জে পুলিশের অভিযানে আটক ২ মাদকসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদকে নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব প্রদান: মহানগর বিএনপি নেতা রেজা রিপনের অভিনন্দন নারায়ণগঞ্জের দায়িত্ব পাওয়ায় প্রতিমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা সোহাগ বিদ্যানিকেতনে বার্ষিক মেধা ও ক্রীড়া পুরস্কার বিতরণ ৫ সেপ্টেম্বর ৬ দফার দাবিতে লংমার্চ: নারায়ণগঞ্জে ডিসি-এসপির সাথে ১১ দলীয় নেতাদের সাক্ষাৎ

বাংলাদেশ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হারানোর পথে, কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪২০ 🪪

বাংলাদেশ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হারানোর পথে, কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি সরকার

মূল বিশ্লেষণ : বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য “সংকট আসছে কি না” প্রশ্নটাই আসলে ভুল প্রশ্ন। সংকট ইতিমধ্যে চলমান, প্রকৃত প্রশ্ন হলো এটা কোন গতিতে অগ্রসর হবে, এবং কোন বাফারগুলো আপাতত এটাকে দৃশ্যমান হতে বাধা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোর সরকারি ও আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করলে একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন ধরা পড়ে- যেসব সূচক দেশের মজুদ বা “স্টক” পরিমাপ করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, প্রবাসী আয়, সেগুলো এই মুহূর্তে ভালো অবস্থানে আছে এবং ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু যেসব সূচক অর্থনীতির প্রকৃত কাঠামোগত স্বাস্থ্য মাপে রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, বাণিজ্য ঘাটতি, সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং, সেগুলোর প্রায় প্রতিটিই অবনতির দিকে যাচ্ছে। বাহ্যিক স্থিতিশীলতা বনাম অভ্যন্তরীণ ক্ষয়ের এই বৈপরীত্যই আগামী এক বছরের অর্থনৈতিক গতিপথ বোঝার মূল চাবিকাঠি।

১. ঋণের বোঝা যেভাবে বাড়ছে

চলতি বছরের জুনে সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে মোট সরকারি ঋণ পৌঁছেছে ১৮৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে, যা জাতীয় উৎপাদনের ৪১ শতাংশ। সংখ্যাটা এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সহনীয় পরিসরে থাকলেও উদ্বেগের জায়গা হলো পরিশোধের গতিপথ। সংস্থাটির নিজস্ব প্রক্ষেপণ বলছে, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ পরিশোধ দেশি ও বিদেশি সুদ-আসল মিলিয়ে দাঁড়াবে ৩০ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে, আর পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হবে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যটি হলো, বিদায়ী অর্থবছরে শুধু দেশি ঋণ পরিশোধই সরকারি রাজস্বের ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রাস করেছে, অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের প্রায় পুরোটাই চলে যাচ্ছে ঋণ পরিশোধে, উন্নয়ন ব্যয় বা ভর্তুকির জন্য কার্যত কিছুই থাকছে না। এর পেছনে কাঠামোগত কারণ স্পষ্ট, ২০১৫ সালে নিম্ন-আয় থেকে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণের পর সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে, গত দশকের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অনুগ্রহকাল শেষ হয়ে এখন আসল ও সুদ একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে, আর গত দুই বছরে টাকার প্রায় ৩৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন বৈদেশিক ঋণের প্রকৃত বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

২. রাজস্ব সংগ্রহ: সমস্যার শিকড়

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে চার লাখ পনেরো হাজার চারশ তিয়াত্তর কোটি টাকা, অর্থাৎ সাড়ে সাতাশি হাজার কোটি টাকা বা প্রায় সাড়ে সতেরো শতাংশ ঘাটতি থেকে গেছে। এটি কোনো এককালীন ব্যর্থতা নয়; গত এক দশক ধরে রাজস্ব বোর্ড প্রতিবারই লক্ষ্যমাত্রা মিস করছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, চলতি অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা, যা অর্জন করতে হলে পঁয়তাল্লিশ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যেখানে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র বারো শতাংশের কাছাকাছি। নীতি সংলাপ কেন্দ্রের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই লক্ষ্যকে “অত্যন্ত অবাস্তব” বলে মন্তব্য করেছেন। কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশে, যা এক দশক আগেও ছিল প্রায় ১১ শতাংশ তুলনীয় যেকোনো অর্থনীতির চেয়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ণয় সংস্থা ফিচ রেটিংসের নিজস্ব মূল্যায়নও এখানে তাৎপর্যপূর্ণ সরকারের সাড়ে ছয় শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও দশ দশমিক দুই শতাংশ রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের লক্ষ্যকে তারা বাস্তবসম্মত মনে করছে না; তাদের নিজস্ব পূর্বাভাস মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ প্রবৃদ্ধি। সরকার ও রেটিং সংস্থার প্রক্ষেপণের মধ্যে এই তিন শতাংশ পয়েন্টের ফারাক নিজেই একটা তাৎপর্যপূর্ণ সংকেত, বাজার সরকারি বাজেট অনুমানকে কতটা কম বিশ্বাস করছে, তার প্রমাণ।

৩. বাণিজ্য ঘাটতি ও রেমিট্যান্সের ভরসা

চলতি আগস্টের শুরুতে প্রকাশিত সম্পূর্ণ বার্ষিক তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় তেতাল্লিশ দশমিক ছিয়াশি বিলিয়ন ডলারে, আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক শতাংশ কম, কার্যত সমতল, যা এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থার একটি। বিপরীতে আমদানি বেড়েছে সাড়ে দশ শতাংশ, পৌঁছেছে একাত্তর বিলিয়ন ডলারের বেশি, ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় বার্ষিক বৃদ্ধি, যার প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমূল্য। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি গিয়ে দাঁড়িয়েছে সাতাশ দশমিক আটাশ বিলিয়ন ডলারে, আগের বছরের তুলনায় চৌত্রিশ শতাংশ বেশি, তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি হিসাবের ঘাটতিও বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক দশমিক পাঁচ নয় বিলিয়ন ডলারে, যেখানে তার আগের বছর এই ঘাটতি ছিল মাত্র একশ আটত্রিশ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ এগারো গুণেরও বেশি বেড়েছে। এই পুরো চিত্রে একমাত্র সুসংবাদ প্রবাসী আয়: বিদায়ী অর্থবছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন রেকর্ড পঁয়ত্রিশ দশমিক ঊনষাট বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের তুলনায় সতেরো দশমিক তিন শতাংশ বেশি। এই প্রবাহ না থাকলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বর্তমান পরিসংখ্যানের বহুগুণ হতে পারত। নীতি সংলাপ কেন্দ্রের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির পেছনে মূল চালিকাশক্তি অভ্যন্তরীণ চাহিদা নয়, বরং বৈশ্বিক কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মূল্য এবং রপ্তানি বাজারে শুল্ক বাধা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ যোগ করেছেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামালের আমদানি এখনো দুর্বল, অর্থাৎ আমদানি বৃদ্ধি প্রকৃত বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবনের লক্ষণ নয়, এটা মূলত জ্বালানি ব্যয়ের ফল। দেশের রপ্তানি আয়ের তিরাশি শতাংশই আসে একক তৈরি পোশাক খাত থেকে ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের তুলনায় এই বহুমুখীকরণের অভাব একটা কাঠামোগত দুর্বলতা, যা যেকোনো একক ধাক্কা সহ্য করার সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

৪. গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: সবচেয়ে দৃশ্যমান আঘাত

গত ২২ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহ সতেরো শতাংশের বেশি কমে গেছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে গড় দৈনিক বিদ্যুৎ ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল এক হাজার চারশ বিরাশি মেগাওয়াটে, আগের সপ্তাহে যা ছিল মাত্র তিনশ বিশ মেগাওয়াট এক সপ্তাহেই প্রায় পাঁচগুণ বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট সময়ে ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ছুঁয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা সতেরো থেকে আঠারো হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে, আর উৎপাদন ঘোরাফেরা করছে চৌদ্দ থেকে সাড়ে পনেরো হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। গ্রামীণ এলাকায় দৈনিক আট থেকে ষোলো ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে। জাতীয় জ্বালানি চাহিদার ষাট থেকে পঁয়ষট্টি শতাংশ এখন আমদানিনির্ভর, যেখানে ২০১০ সালে দেশি গ্যাসের অংশ ছিল পঁচাত্তর শতাংশের বেশি, বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা দেশি গ্যাসের মজুদ ২০৩১ সালের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত করেছে, গত মার্চে কাতারএনার্জি একটি “সম্ভাব্য ফোর্স মেজর” নোটিশ পাঠায়, ফলে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণ দামে (প্রায় বিশ থেকে একুশ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ) গ্যাস কিনতে হচ্ছে; শুধু এপ্রিল-জুন প্রান্তিকেই ভর্তুকি বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় এক দশমিক শূন্য সাত বিলিয়ন ডলার। শিল্পখাতে এর প্রভাব প্রত্যক্ষ, মেঘনা গ্রুপের সাতান্নটি কারখানা গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ডিজেল ব্যবহার বেড়েছে তিনশ নব্বই শতাংশ, গাজীপুরের একটি দুই হাজার শ্রমিকের কারখানা প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা উৎপাদন হারাচ্ছে। এই জ্বালানি সংকট আর ওপরে উল্লেখিত বাণিজ্য ঘাটতি একই মুদ্রার দুই পিঠ জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয়ই মূলত বাণিজ্য ঘাটতির চৌত্রিশ শতাংশ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি।

৫. ব্যাংকিং খাত: সবচেয়ে কম আলোচিত, সবচেয়ে বিপজ্জনক

মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে স্থূল খেলাপি ঋণের হার পৌঁছেছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, শুধু যুদ্ধরত ইউক্রেনের (৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ) পেছনে। তুলনামূলক চিত্র আরও স্পষ্ট করে তোলে সমস্যার ব্যাপকতা পাকিস্তানে এই হার সাড়ে সাত শতাংশ, ভারতে সোয়া দুই শতাংশ, সংকটাপন্ন শ্রীলঙ্কাতেও মাত্র সাড়ে বারো শতাংশ। এর প্রত্যক্ষ পরিণতি বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধস, গত ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ১ শতাংশ থেকে মার্চে নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে। একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি পৌঁছেছে চব্বিশ শতাংশে, অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর সীমিত তারল্য ক্রমশ সরকারকেই অর্থায়ন করছে, বেসরকারি খাত বঞ্চিত হচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ লাখেরও বেশি ঋণ হিসাব এখন খেলাপি, আর এক কোটি টাকার নিচের ছোট খেলাপি হিসাবের সংখ্যা এক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী এটি মূলত রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ফল শাসন-দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, জাল আর্থিক বিবরণী ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রতি নমনীয়তা। ২০২৫ সালের একটি স্বাধীন পর্যালোচনা আগে লুকিয়ে থাকা খেলাপি ঋণ প্রকাশ করে দিয়েছে, সমস্যা নতুন নয়, শুধু এখন দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আঠারো মাসের একটি সাত দফা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে বটে, তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব কি না।

৬. আটকে থাকা আইএমএফ কর্মসূচি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে বাংলাদেশের সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির মধ্যে এখনো বাকি রয়েছে এক দশমিক ছিয়াশি বিলিয়ন ডলার। গত এপ্রিলে ষষ্ঠ কিস্তি, এক দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার আটকে যায়, কারণ রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং সংস্কার, ভর্তুকি প্রত্যাহার ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, এই চারটি শর্তের একটিও পূরণ হয়নি। এ মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী সংস্থাটি প্রায় এক ডজন শর্ত বেঁধে দিয়েছে, আর কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী জানুয়ারিতে। এদিকে সরকার একই সঙ্গে আরও দুই বিলিয়ন ডলার নতুন বাজেট সহায়তাও চাইছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ শুধু অবশিষ্ট অর্থের জন্য নয়, আইএমএফ কর্মসূচি স্থগিত থাকা একটি সিগন্যালিং সমস্যা তৈরি করে, কারণ বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতারা প্রায়ই আইএমএফের সবুজ সংকেতের ওপর নির্ভর করে নিজেদের অর্থায়ন এগিয়ে নেয়।

৭. রেটিং সংস্থার সতর্কবার্তা

গত ১৩ মে ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণমান বি-প্লাস অপরিবর্তিত রেখে দৃষ্টিভঙ্গি স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচকে নামিয়ে দেয়। সংস্থাটির নিজস্ব বিশ্লেষণ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক কারণ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক প্রবাসী আয় ও অপরিশোধিত তেল আমদানির পনেরো শতাংশ এই অঞ্চল থেকেই আসে। তবে আসল কারণ আরও গভীরে, সংস্কারের ধীরগতি দেশের ধাক্কা সহ্য করার সক্ষমতা ক্ষয় করছে। রাজস্ব বাড়ার কথা ছিল আইএমএফ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী, বদলে তা কমেছে; রিজার্ভ সাড়ে ঊনত্রিশ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়ে বি-রেটেড দেশগুলোর গড়ের নিচে। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে তিনটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছে যা রেটিংকে পরবর্তী ধাপ বি-তে নামিয়ে দিতে পারে: আইএমএফ কর্মসূচিতে ফাটল, রিজার্ভ তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের নিচে নেমে যাওয়া, অথবা কোনো বড় ব্যাংকের ব্যর্থতা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই তিনটি ঝুঁকিই ওপরে আলোচিত সমস্যাগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। রেটিং বি-তে নেমে গেলে যা পাকিস্তানের কোহোর্ট, অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ম্যান্ডেট বাংলাদেশের সার্বভৌম ঋণপত্রে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ করে দেয়, এবং বাস্তবে পুঁজি প্রস্থান আনুষ্ঠানিক ডাউনগ্রেডের আগেই শুরু হয়ে যায়, কারণ বিনিয়োগকারীরা আগাম অবস্থান পুনর্বিন্যাস করেন। সার্বভৌম রেটিং কমলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক ঋণ-সীমা ও খরচ দুটোই প্রভাবিত হয়, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

৮. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দল হয়েছে, আর আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। অপেক্ষাকৃত বিশ্বাসযোগ্য এই নির্বাচন ও স্থিতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নীতিগত ধারাবাহিকতার সুযোগ তৈরি করে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক। কিন্তু আইএমএফের কঠোর শর্ত বাস্তবায়নে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে, বিশেষত যখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধির। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র এবং কার্নেগি এনডাউমেন্টের বিশ্লেষকদের ভাষায়, শক্তিশালী নির্বাচনী ম্যান্ডেট থাকা মানেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত নয় তা অর্জন করতে হবে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। জামায়াতের দ্রুত উত্থান, ১৯৯১ সালের সর্বোচ্চ আঠারো আসন থেকে এবার সাতাত্তর আসনে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ানোর সম্ভাবনা রাখে।

৯. একটি চক্রের ভেতরে অর্থনীতি

এই সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এরা একে অপরকে পুষ্ট করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে, যা আমদানি ব্যয় ও বাণিজ্য ঘাটতি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এটি গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ সংকুচিত করে কারখানা বন্ধ ও উৎপাদন হ্রাসের কারণ হয়েছে, ফলে রপ্তানি আয় স্থবির থেকে গেছে। রপ্তানি স্থবিরতা ও বাণিজ্য ঘাটতি দুটোই মিলে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করছে। কর্মসংস্থান হ্রাসের ফলে করদাতার সংখ্যা কমছে, যা রাজস্ব বোর্ডের ঘাটতিকে আরও গভীর করছে। রাজস্ব ঘাটতি সরকারকে দেশি ঋণের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তুলছে, আর ব্যাংকগুলোতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিকে সংকুচিত করে দিচ্ছে, ফলে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সমান্তরালে, ব্যাংকিং খাতে বত্রিশ শতাংশ খেলাপি ঋণ তারল্য সংকট তৈরি করছে, যা আইএমএফের শর্ত পূরণে ব্যর্থতা এবং সেই সূত্রে ফিচের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্ভাব্য পুঁজি প্রস্থানের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই পুরো চক্রের মধ্যে একমাত্র স্থিতিস্থাপক উপাদান হলো প্রবাসী আয়। রেকর্ড প্রবাহ না থাকলে চলতি হিসাবের ঘাটতি এখনকার তুলনায় বহুগুণ বেশি হতো এবং রিজার্ভ পতনের চাপ আরও তীব্র হতো। তবে প্রবাসী আয় মূলত একটি “সময় কেনার” প্রক্রিয়া, এটি রাজস্ব, ব্যাংকিং বা জ্বালানি-নির্ভরতার কাঠামোগত সমস্যা সমাধান করে না, শুধু সেগুলোর প্রকাশ বিলম্বিত করে।

১০. সামনের এক বছর

সবচেয়ে সম্ভাব্য গতিপথ হলো একটি ধীর, ব্যথাদায়ক স্থিতিশীলতা, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি সামান্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখবে, আইএমএফের সঙ্গে আংশিক সমঝোতা হবে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাস্তবে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার শতাংশের মধ্যে থাকবে, সরকারি সাড়ে ছয় শতাংশ লক্ষ্যের ধারেকাছেও না, কিন্তু ব্যাংকিং ও কর্মসংস্থান সংকট অব্যাহত থাকবে। এর পাশাপাশি একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে জ্বালানি-চালিত তীব্র সংকোচনের, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং আগামী বছরের গ্রীষ্মে, যখন বিদ্যুৎ চাহিদা শীর্ষে ওঠে, এলএনজি সরবরাহ পর্যাপ্ত না হয়। আরও গুরুতর হলেও কম সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো আর্থিক খাতে সংকট ছড়িয়ে পড়া, যদি ফিচের চিহ্নিত কোনো ট্রিগার, বিশেষত কোনো বড় ব্যাংকের ব্যর্থতা বাস্তবে ঘটে। একক কোনো বড় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম, কারণ রিজার্ভ ও প্রবাসী আয় এই মুহূর্তে যথেষ্ট শক্তিশালী বাফার তৈরি করেছে। প্রকৃত ঝুঁকি বরং একটি ধীরগতির কাঠামোগত ক্ষয় যা হয়তো কোনো একক দিনের প্রধান শিরোনাম হবে না, কিন্তু ছোট ব্যবসায়ী, রপ্তানি-নির্ভর শ্রমিক ও করদাতাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে।

আগামী কয়েক মাসে তিনটি বিষয়ের দিকে বিশেষভাবে নজর রাখা প্রয়োজন, নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ কার্যকর হওয়া, যা শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর প্রকৃত প্রভাব রপ্তানিতে প্রথম স্পষ্ট করবে, জানুয়ারিতে আইএমএফ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হওয়া, এবং আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ চাহিদার শীর্ষ সময়ে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি। এই তিনটি বিন্দুই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ধীর ক্ষয়ের পথ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, নাকি সংকট আরও গভীর হবে।

বিশ্লেষক: নাজমুল আনছারী, অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা ও কৌশলবিদ.

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2020 All rights reserved Daily Narayanganj
Design by: SHAMIR IT
themesba-lates1749691102