বৈদেশিক ঋণের ভারে হাঁটা একটি দেশ, আর তার কাঁধে দাঁড়ানো ছোট ব্যবসায়ীরা, এটাই বর্তমানে দেশের সামগ্রিক অর্থ বাণিজ্যের চিত্র। গত কয়েক মাসের বাজারব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত এবং অর্থনৈতিক তথ্য-প্রমাণ ও যুক্তিনির্ভর প্রতিবেদন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন একসঙ্গে রেখে দেখলে স্পষ্ট হয়, এই অস্থিরতা সাময়িক নয়, এটি একটি কাঠামোগত সংকটের স্পষ্ট প্রোফাইল। অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা দেশের বহু পরামর্শক ও বিশেষজ্ঞও একমত পোষণ করছেন যে, এই অস্থিরতার উদ্বেগজনক সংখ্যাগুলো যতটা বলে, তার চেয়ে বেশি সংখ্যাগুলোর গতিপথ, আর সেই গতিপথ এখন ঊর্ধ্বমুখী।
ঋণের কাঠামো: বাহ্যিক ঝুঁকি থেকে অভ্যন্তরীণ সংকটে রূপান্তর।
সরকারের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৭৮.০৬৭ বিলিয়ন ডলার। এই সংখ্যা নিজে ভয়াবহ নয়, ভয়াবহ এর গতিপ্রকৃতি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ পৌঁছেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে (আসল ও সুদ মিলিয়ে প্রায় ৪.৪৯ বিলিয়ন ডলার), অথচ একই সময়ে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি নেমে গেছে গত চোদ্দ বছরের সর্বনিম্নে। এই দুই সূচক একসাথে পড়লে যে চিত্র তৈরি হয়, তা হলো বাংলাদেশ এখন পুরনো দেনা শোধ করছে দ্রুতগতিতে, কিন্তু নতুন সহজ শর্তের অর্থায়ন পাচ্ছে ধীরগতিতে। এই ব্যবধান পূরণ করতে রাষ্ট্রকে দুটো পথে যেতে হয়, বাজারভিত্তিক (floating-rate, ব্যয়বহুল) ঋণ নেওয়া, নয়তো অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দ্বিতীয় পথে ঝুঁকেছে, যার ফল অভ্যন্তরীণ সুদ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বাজেট ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই কারণেই আইএমএফ প্রতিনিধিদল সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশের ঋণের ব্যয়, গড় সুদ, ফ্লোটিং-রেট ঋণের অনুপাত, এবং পরিশোধ সক্ষমতা পর্যালোচনা করেছে। তাদের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ এখন “কম ঝুঁকি” থেকে “মাঝারি ঝুঁকি”তে প্রবেশ করছে। আগামী পাঁচ বছরে ২৬ বিলিয়ন ডলার শোধের বাধ্যবাধকতা এই মূল্যায়নের কেন্দ্রে। চলতি অর্থবছরে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সামগ্রিক ঋণ পরিশোধের বোঝা ৩০.৫৯ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণে পৌঁছাবে বলে সরকারি প্রক্ষেপণ বলছে, আমরা বেসরকারিভাবে যে সংখ্যাটি পেয়েছি তাও এর কাছাকাছি। এটি রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতার তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য অনুপাত, যা উন্নয়ন ব্যয় ও ভর্তুকির জায়গা সংকুচিত করবে।
ব্যাংকিং খাত: এখানেই প্রকৃত ভঙ্গুরতা।
ব্যাংকিং খাতের সংকট একটি একরৈখিক অবনতির প্যাটার্ন অনুসরণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। তিন মাস আগে, ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে এই অনুপাত ছিল প্রায় ৩১ শতাংশ মানে একটি প্রান্তিকেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা।
এই সংকট সুষমভাবে বণ্টিত নয়, এটি কেন্দ্রীভূত এবং সেই কেন্দ্রীভবনই মূল বিপদ। খেলাপি ঋণের ৮৫ শতাংশ আটকে আছে মাত্র পনেরোটি ব্যাংকে, শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার আরও ভয়াবহ, প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যায়ে, যেখানে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এই হার তুলনামূলক কম হলেও ২৮ শতাংশের ওপরে। এর সাথে যোগ করা দরকার প্রভিশনিং ঘাটতির চিত্র, শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যাংকগুলোর ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এর অর্থ, খেলাপি হওয়া টাকার একটি বড় অংশের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা মূলধনও নেই, এটি নিছক ঋণ আদায়ের সমস্যা নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক সচ্ছলতার (solvency) প্রশ্ন।
ঋণ আদায়ের হার নেমে এসেছে ৭৮ শতাংশে, যেখানে কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এই হার ৮৫-৯০ শতাংশ থাকা প্রত্যাশিত। এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় এক লাখ কোটি টাকার সুদ মওকুফসহ “বিশেষ এক্সিট সুবিধা” চালু করেছে, এই সিদ্ধান্তটি নিজেই একটি স্বীকারোক্তি যে, এই অর্থের একটি বড় অংশ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আর আদায়যোগ্য নয় বলে নীতিনির্ধারকরা ধরে নিয়েছেন। একটি ব্যাংকিং খাত যখন নিজের বকেয়া আদায়ে হিমশিম খায় এবং প্রভিশনিং ঘাটতিতে ভোগে, তখন নতুন ঋণ বিতরণে তার ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়, এটি নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক।
সামষ্টিক অর্থনীতি: প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির দ্বিমুখী চাপ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রান্তিকভিত্তিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতিপথ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নিজস্ব তথ্যেই স্পষ্ট, প্রথম প্রান্তিকে ৪.৯৬ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩.০৩ শতাংশ, তৃতীয় প্রান্তিকে ২.২২ শতাংশ। এই একটানা পতনের পেছনে শিল্প ও সেবা খাতের বড় সংকোচন কাজ করছে বলে বিবিএসের বিশ্লেষণ বলছে। এই প্রবণতা বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসেও প্রতিফলিত, আইএমএফ সতর্ক করেছে, কাঠামোগত সংস্কার ত্বরান্বিত না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.৫ শতাংশে। ফিচ রেটিংস স্বাধীনভাবে একই প্রক্ষেপণে পৌঁছেছে, এবং সরকারের নিজস্ব উচ্চতর লক্ষ্যমাত্রাকে “অতি-আশাবাদী” বলে চিহ্নিত করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক তুলনামূলক আশাবাদী থেকে ৪.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রাখলেও, তারা একই সাথে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস এপ্রিলের ৮.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮.৮ শতাংশ করেছে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারজনিত চাপকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
মূল্যস্ফীতির মাসভিত্তিক গতিপথও এই চাপের সাক্ষ্য দেয়, মার্চ ৮.৭১ শতাংশ, এপ্রিল ৯.০৪ শতাংশ, মে ৯.৪২ শতাংশ (গত ষোলো মাসের সর্বোচ্চ, দুই দফা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাবে), জুন ৯.১৬ শতাংশ। মাসভিত্তিক এই সামান্য প্রশমনকে প্রকৃত উপশম হিসেবে ধরা ভুল হবে, জুন ২০২৫-এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৪৮ শতাংশ, অর্থাৎ বার্ষিক ভিত্তিতে চাপ প্রকৃতপক্ষে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থাৎ ঋণের ব্যয় নিকট ভবিষ্যতে কমছে না।
এর বিপরীতে দুটি ইতিবাচক সূচক আছে, যা প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ মাস পর আবার ৩৬ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে এবং ২ আগস্ট পর্যন্ত হিসাবে ৩৬.৪৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, রফতানি এপ্রিলে আট মাসের নেতিবাচক ধারা ভেঙে ৩২.৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, এবং রেমিট্যান্স নিয়মিত প্রবাহ বজায় রেখেছে। কিন্তু পরামর্শদাতার দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি, বহিঃখাতের এই স্থিতিশীলতা অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতাকে প্রশমিত করে না। রিজার্ভ ও রপ্তানি একটি অর্থনীতির বাহ্যিক ভারসাম্যের সূচক, খেলাপি ঋণ, প্রভিশনিং ঘাটতি ও প্রান্তিকভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পতন অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সক্ষমতার সূচক। দুটো একই সাথে ভিন্ন দিকে চলতে পারে, এবং এখন ঠিক তাই ঘটছে।
নতুন উদ্যোক্তার ওপর প্রভাব: নির্দিষ্ট চ্যানেল এবং প্রভাব।
অর্থায়ন ব্যয়: নীতি সুদহার ১০ শতাংশে স্থির থাকায় ব্যাংকঋণের কার্যকর সুদ ১৩-১৬ শতাংশ পরিসরে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য এই ব্যয় প্রাথমিক মূলধন কাঠামোতেই একটি বড় চাপ তৈরি করে।
ঋণপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা: যে ব্যাংক প্রভিশনিং ঘাটতি ও উচ্চ খেলাপির চাপে আছে, সে ঝুঁকিপূর্ণ, ট্র্যাক রেকর্ড-বিহীন গ্রাহকের প্রতি স্বাভাবিকভাবে রক্ষণশীল হয়ে ওঠে জামানতের শর্ত কঠোর হয়, অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়।
চাহিদার দুর্বলতা: প্রায় দুই বছর ধরে ৮-৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতিতে থাকা ভোক্তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত, নতুন ব্র্যান্ডের বাজার-প্রবেশ ব্যয় (customer acquisition cost) বেড়ে যায়।
আমদানি ও বিনিময় হার ঝুঁকি: কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ আমদানি-নির্ভর ব্যবসার জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা ও বিনিময় হারের অস্থিরতা অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা যোগ করে, বিশেষত রাষ্ট্রের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
মার্জিন সংকোচন: পরিচালন ব্যয় (জ্বালানি-সংবেদনশীল পরিবহন, ইউটিলিটি) ঊর্ধ্বমুখী থাকা অবস্থায় বিক্রয় প্রবৃদ্ধি জিডিপির প্রান্তিকভিত্তিক পতনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দুর্বল হতে পারে — এই দুই চাপ একসাথে লাভের মার্জিনকে সংকুচিত করে।
ঋণ পরিশোধের চাপ: বিদ্যমান ঋণগ্রহীতাদের জন্য, বিশেষত যাদের আয় প্রবৃদ্ধির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে, যা খেলাপি ঋণের চক্রকে আরও বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা: মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে শিপিং ব্যয় ও জ্বালানি মূল্যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে, যা ইতিমধ্যে দুর্বল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করবে।
কৌশলগত সুপারিশ এবং দিকনির্দশনা হতে পারে।
১. ঋণ পুনর্গঠন অগ্রাধিকারমূলক ও তাৎক্ষণিক হওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ মওকুফ ও এক্সিট সুবিধা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার (৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে) মধ্যে সীমাবদ্ধ। খেলাপি হওয়ার অপেক্ষা না করে সক্রিয়ভাবে ব্যাংকের সাথে আলোচনায় বসা প্রয়োজন।
২. তারল্য মজুতকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিতে হবে।প্রান্তিকভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পতনের প্রেক্ষাপটে আয়ের অনিশ্চয়তা বাড়ছে, ন্যূনতম চার থেকে ছয় মাসের পরিচালন ব্যয় সমপরিমাণ নগদ প্রবাহ সংরক্ষণ যুক্তিসঙ্গত ন্যূনতম মানদণ্ড হওয়া উচিত।
৩. নতুন মূলধন বিনিয়োগ ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত হতে হবে, ধারণা-চালিত নয়। নীতি সুদহার আগামী ছয় মাসে অপরিবর্তিত থাকার নিশ্চয়তা থাকায়, সস্তা অর্থায়নের প্রত্যাশায় সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করার যৌক্তিকতা কম; বরং আগামী দুই প্রান্তিকের মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির তথ্য পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করা অধিকতর বিচক্ষণ।
৪. আমদানি-নির্ভরতা যেখানে সম্ভব হ্রাস করা এবং বিনিময় হার ঝুঁকি হেজ করার কৌশল বিবেচনা করা প্রয়োজন, বিশেষত রাষ্ট্রের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা অবস্থায়।
৫. মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত ভোক্তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বিশ্লেষণ করে নেওয়া উচিত। ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ক্লান্ত ভোক্তা মূল্য-সংবেদনশীলতা বাড়িয়েছে, স্বল্প মার্জিনে বিক্রয় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, বাজার-অংশ হারানোর চেয়ে অধিকতর টেকসই কৌশল।
৬. ব্যাংক-নির্ভরতা বৈচিত্র্যকরণ প্রয়োজন। যেসব ব্যাংকে খেলাপির হার ও প্রভিশনিং ঘাটতি তুলনামূলক বেশি, তাদের ওপর একক নির্ভরতা প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি তৈরি করে, নগদ প্রবাহ ও ঋণ সম্পর্ক একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিন্যস্ত রাখা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতি।
অর্থনীতি নিয়ে খুব গভীর ধারণা না থাকা একজন সাধারণ মানুষ যদি আমাকে পুরো বিষয়টা মূল্যায়ন করতে বলেন, আমি বলব সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোর তথ্য একসঙ্গে পড়লে একটি সুস্পষ্ট চিত্র উঠে আসে। ঋণ পরিশোধের বোঝা সর্বোচ্চ পর্যায়ে, খেলাপি ঋণ প্রতি প্রান্তিকে বাড়ছে, প্রভিশনিং ঘাটতি ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, প্রবৃদ্ধি একটানা নিম্নমুখী। এর সঙ্গে আইএমএফ, ফিচ রেটিংস ও এডিবির মতো তিনটি স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন স্বাধীনভাবে একই দিকনির্দেশক উপসংহারে পৌঁছাচ্ছে, তখন বিষয়টিকে আর হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। রিজার্ভ ও রপ্তানির ইতিবাচক প্রবণতা বাস্তব এবং অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। কিন্তু এটাও বুঝতে হবে, এই ইতিবাচক দিকগুলো আমাদের কাঠামোগত ঝুঁকিগুলোকে দূর করছে না, বরং আমাদের হাতে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় তৈরি করছে।
যে ব্যবসায়ী এই সংকেতগুলো সময়মতো বুঝে নিজের সিদ্ধান্তের মধ্যে নিয়ে আসতে পারবেন, আগামী দেড় বছরের অনিশ্চয়তা তার জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে না, বরং যারা প্রস্তুত হতে দেরি করবে, তাদের তুলনায় টিকে থাকা এবং এগিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত সুবিধায় পরিণত হবে।
বিশ্লেষণ : নাজমুল আনছারী, অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা এবং কৌশলবিদ