সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাময়িক বরখাস্ত বা তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ সদর প্রধান ডাকঘরের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। একজন দৈনিক ভিত্তিক (ইডি) কর্মচারী হয়েও সামিয়া ইসলাম যেভাবে পুরো একটি প্রধান ডাকঘর নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং পাহাড়সম অভিযোগের পরও ‘বহাল তবিয়তে’ আছেন, তা এখন আলোচিত। প্রশ্ন উঠেছে— সামিয়ার এই খুঁটির জোর কোথায়?
অনুসন্ধানে দেখা যায়, যোগদানের পর থেকেই সামিয়া ইসলাম ডাকঘরটিকে নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। একজন ডেইলি বেসিস কর্মচারীর কাজ যেখানে সুনির্দিষ্ট, সেখানে তিনি প্রেষণের দোহাই দিয়ে হেল্প ডেস্ক দখল করে বসে আছেন। সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে ফরম পূরণ থেকে শুরু করে সঞ্চয়পত্র ভাঙানো বা মৃত দাবি নিষ্পত্তির মতো স্পর্শকাতর কাজেও তিনি ‘ফি’ আদায় করছেন। সরকারি সেবা যেখানে জনকল্যাণমূলক হওয়ার কথা, সামিয়ার সিন্ডিকেটের কারণে তা এখন ‘চুক্তিনির্ভর’ হয়ে পড়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সদর পোস্ট অফিসের বর্তমান কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সামিয়ার যাবতীয় অনৈতিক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে কিছু কর্মকর্তাদের পরোক্ষ প্রশ্রয়। লেটার হেড রাইটারদের লিখিত অভিযোগ কিংবা সহকর্মীদের অর্থ আত্মসাতের স্বীকারোক্তির পরও কেন সামিয়ার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এই নীরবতা কি কেবলই অদক্ষতা, নাকি এর পেছনে কোনো বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের অংশীদারিত্ব রয়েছে— সেই প্রশ্ন এখন মুখে মুখে।
সামিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ হলো তিনি নিজ দপ্তরের সহকর্মীদেরও ছাড় দেননি। স্থায়ী চাকরি বা বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে সহকর্মীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া কেবল দাপ্তরিক অপরাধ নয়, বরং ফৌজদারি অপরাধ। সালিশি বৈঠকে টাকা কথা স্বীকার করার পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া প্রমাণ করে যে, তিনি প্রতিষ্ঠানের চেইন অব কমান্ডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যতার দোহাই দিয়ে তিনি এক ধরনের ‘ভীতি’ তৈরি করে রেখেছেন, যা সাধারণ কর্মচারীদের কণ্ঠরোধ করে রেখেছে।
ডাক বিভাগ বর্তমানে আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে একজন সাধারণ কর্মচারীর কারণে পুরো বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া কাম্য নয়। ভুক্তভোগীদের মতে, সামিয়া ইসলামের মতো ব্যক্তিদের দাপট বজায় থাকলে সাধারণ মানুষ সরকারি ডাকসেবার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে তাকে অপসারণ করা এবং তার দুর্নীতির ভাগীদারদের খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
সামিয়া ইসলাম কোনো শক্তিশালী মহলের আর্শীবাদপুষ্ট না হলে এতো বড় দুঃসাহস দেখানোর কথা নয়। এখন দেখার বিষয়, ডাক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই ‘ওপেন সিক্রেট’ অনিয়মের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেন, নাকি সামিয়া ইসলামের এই ‘অজেয়’ সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত হতে থাকে।
এই ডাক বিভাগের গ্রাহকেরা এখন তাকিয়ে আছে ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের দিকে। দুর্নীতিমুক্ত ডাকসেবা নিশ্চিত করতে হলে এই সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো বিকল্প নেই।