নারায়ণগঞ্জের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর আবদুর রহমানের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দুই বছর আগে আজকের এই দিনে (১৫ জুন, ২০২৪) তিনি অসংখ্য গুণগ্রাহী ও সহযোদ্ধাদের কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান।
১৯৪৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়ার নয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহমান। তাঁর বাবার নাম শাহেদ আলী এবং মায়ের নাম আমেনা বেগম। ছাত্রজীবনে অষ্টম শ্রেণিতে থাকাকালেই ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় তাঁর। পরবর্তীতে ছাত্রলীগের বৃহত্তর ঢাকা জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ৬ দফা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের এই লড়াকু সৈনিক পরবর্তীতে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তিনি মেনে নিতে পারেননি। পরবর্তীতে বাকশাল গঠিত হলে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি কারাবরণও করেন। কেবল দলীয় রাজনীতি নয়, পাটকল ও রিকশা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।
নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি যৌক্তিক ও নাগরিক আন্দোলনে আবদুর রহমান ছিলেন এক নির্ভরযোগ্য নাম। ১৯৯২ সালে জেলায় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। প্রায় এক যুগ তিনি ‘নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটি, যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম এবং সম্মিলিত ভূমি রক্ষা নাগরিক পরিষদের সাথে যুক্ত থেকে তিনি ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করেছেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর পদচারণা ছিল অগ্রগণ্য। তিনি ছিলেন শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমির সভাপতি এবং চারুগঞ্জ একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এছাড়া আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। উত্তরণ ও উন্মোচনের মতো সামাজিক সংগঠনের সাথেও তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
আবদুর রহমান কেবল রাজপথের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মানুষ। জশনে জুলুস ঈদে মিলাদুন্নবী, সুন্নী ঐক্য পরিষদ, বাইতুল ইজ্জত জামে মসজিদ ও দেওভোগ মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি যুক্ত থেকে ধর্মীয় ও সামাজিক সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
আবদুর রহমান ছিলেন একজন নির্ভীক, সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং আদর্শে অবিচল এক ব্যক্তিত্ব। সমাজে বিরাজমান অন্যায়, নিপীড়ন ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে তিনি কখনোই মাথা নত করেননি। আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। তাঁর শূন্যতা নারায়ণগঞ্জের নাগরিক আন্দোলনে আজও এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত।