প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জ শুধু একটি জেলা শহর নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। দেশের বৃহত্তম নদীবন্দর, বিকেএমইএ, বিসিক শিল্পনগরী, হোসিয়ারি শিল্প— সব মিলিয়ে এই শহর প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার অর্থনীতি সচল রাখে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয়, সম্ভাবনার এই শহরটি আজ চারটি ভয়াবহ ব্যাধিতে আক্রান্ত— মাদক, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি এবং যানজট। এর সাথে যুক্ত হয়েছে হকার সমস্যা, জলাবদ্ধতা ও ভঙ্গুর রাস্তাঘাট। এই সমস্যাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই খণ্ডিত অভিযান নয়, প্রয়োজন একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা।
মাদক হচ্ছে সব অপরাধের জননী।আমার অনুসন্ধানে দেখেছি, নারায়ণগঞ্জের কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চুরি— সব অপরাধের মূলে রয়েছে মাদক। সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা, বন্দর, সোনারগাঁও, আড়াই হাজার, রূপগঞ্জ ও সদরের বিভিন্ন স্পট এখন মাদকের হাট। শুধু মাদকসেবী ও গুটিকয়েক মাদক ব্যবসায়ীদেব গ্রেফতার করে এ সমস্যার সমাধান হবে না।
মুক্তির উপায়:-
ক) পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদকসেবীকে গ্রেফতার সহ নিরাময় কেন্দ্রে পাঠাতে হবে।
খ) প্রতিটি ওয়ার্ডে মসজিদের ইমাম, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে “মাদক প্রতিরোধ কমিটি” গঠন করতে হবে।
গ) সড়ক ও নদীপথে মাদক প্রবেশ বন্ধে পুলিশের চেক পোস্ট ও নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের টহল বাড়াতে হবে।
কিশোর গ্যাং: বিপথগামী ভবিষ্যৎ।
যে বয়সে স্কুলে থাকার কথা, সে বয়সে তারা গ্রুপিং, দেশীয় অস্ত্র ও টিকটকের নেশায় মত্ত। এরা তৈরি হচ্ছে বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে। এর পেছনে পারিবারিক উদাসীনতা ও রাজনৈতিক প্রশ্রয় দায়ী।
মুক্তির উপায়:–
ক) জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও শিক্ষা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে।
খ) কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক ছত্রছায়া যেন না থাকে।
গ) খেলার মাঠ, শিশু একাডেমি ও শিশু পার্কগুলোকে সক্রিয় করতে হবে।
চাঁদাবাজি: ব্যবসায়ীদের গলার কাঁটা।
পরিবহন খাত, ফুটপাত, ট্রাক স্ট্যান্ড ও শিল্প এলাকায় চাঁদাবাজি নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
মুক্তির উপায়:-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের জন্য একটি হটলাইন (যেমন: ৯৯৯-এর আদলে) চালু করতে হবে যেখানে পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ করা যাবে। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের যৌথ মোবাইল কোর্ট মাসে অন্তত দুবার পরিচালনা করতে হবে।
যানজট ও হকারমুক্ত ফুটপাত: একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
বিবি রোড, চাষাঢ়া, সাইনবোর্ড, কালীরবাজার— যানজটের প্রধান কারণ অবৈধ পার্কিং, ব্যাটারিচালিত অটো এবং ফুটপাত দখল। হকার উচ্ছেদ করলেই সমাধান হবে না, যদি পুনর্বাসন না করা হয়।
আমার প্রস্তাবনা:-
ক) বিকেএমইএ ও এনসিসিআই-এর উদ্যোগে ২২ জন ট্রাফিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর সংখ্যা ১০০ জনে উন্নীত করতে হবে এবং তাদের পুলিশের মতো ক্ষমতা নয়, সচেতনতামূলক দায়িত্ব দিতে হবে।
খ) রেললাইনের পাশে হকারদের জন্য যে অস্থায়ী মার্কেট করার উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। হকারদের জন্য “নো-হকার জোন” এবং “হকার জোন” সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
গ) শহরের প্রবেশমুখে— সাইনবোর্ড, পঞ্চবটি ও চাষাঢ়ায় তিনটি স্থানকে যানজট নিরসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।
জলাবদ্ধতা ও রাস্তাঘাট: পরিকল্পনার অভাব।
সামান্য বৃষ্টিতেই ডিএনডি খাল ও ড্রেন উপচে চাষাঢ়া-মাসদাইর সহ বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যায়। কারণ খাল দখল ও ড্রেনে ময়লা ফেলা।
মুক্তির উপায়:-
ক) জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও এনডিএ-এর সমন্বয়ে খাল উদ্ধার ও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। ডিসি অফিস থেকে চানমারী পর্যন্ত যে পরিচ্ছন্নতা অভিযান হয়েছে, তা প্রতি ওয়ার্ডে সপ্তাহে একবার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
খ) রাস্তা কাটার পর সমন্বয়হীনতা বন্ধে “ওয়ান স্টপ সার্ভিস” চালু করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, নারায়ণগঞ্জের সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন,জেলা পুলিশ, এনডিএ, বিকেএমইএ ও এনসিসিআই ও নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব কে এক টেবিলে বসতে হবে। আমরা সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা সচেতনতা তৈরি করতে পারি, কিন্তু বাস্তবায়ন করবে প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জকে একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মানবিক শহর হিসেবে গড়তে এখনই সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়ন করা সময়ের দাবি।
_লেখক: এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও মানবাধিকার কর্মী।