বাংলা সনের জন্ম কথা
-শুভ নববর্ষ-১৪৩৩
বাংলা ভাষা যেমন আমাদের সম্পদ তেমনি বাংলা সন এবং শুভ নববর্ষ আমাদের জাতীয় সম্পদ। পৃথিবীর যে কোন জাতীর পূর্ণাঙ্গতার স্বীকৃতির অন্যতম উপাদান হচ্ছে তার নিজস্ব দিন পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার। আমাদের অহংকার এই বাংলা সন যা নববর্ষের সুতায় বাঙালী জাতিকে বেঁধে দিয়ে সম্রাট আকবর বাঙ্গালী জাতির কাছে অম্লান হয়ে আছে। বাংলা সন হলো আমাদের জাতীর একটি অলংকার, যা আমাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। পহেলা বৈশাখ-নববর্ষে আমাদের প্রাণে এক নতুন আলো সঞ্চালিত হয়, হৃদয়ে প্রস্ফুটিত হয় বন্ধুত্বের অবগাহন। আমাদের চারপাশে একদল লোক আছে তারা না জেনে না বুঝে আমাদের প্রজন্মকে ভুল বুঝাতে অযথা নববর্ষের নানা আয়োজন-অনুষ্ঠান সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা প্রচার করে থাকেন। ১৫৫৬ খ্রীষ্টাব্দ এবং আরবি সন হিজরী ৯৬৩ সন থেকে বাংলা সনের পদযাত্রা শুরু। চলতি ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দে বাংলার সনের বয়স ৪৭০ বছর। অনেকের কাছে প্রশ্ন জাগতে পারে সনের আবার বয়স কেমন করে হয় ? ২য় মোঘল স¤্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে পুরনো মোঘল গোত্রগুলো দিল্লির সিংহাসন দখল করা নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে উঠে। উত্তরাধিকার ভাবে যুবরাজ আকবর স¤্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহনের পূর্বে তাকে হত্যা করার গোপন ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে মা হামিদা বেগম ও ফুফু গোলবদন এক রাতের অন্ধকারে আকবরকে নিয়ে ছদ্মবেশে প্রাসাদের গুপ্ত পথ দিয়ে বাহির হয়ে যায়। অত:পর প্রধান সেনাপতি বৈরাম খাঁর অনুগত সৈনিক বেষ্টিতে হয়ে দিল্লির দূরবর্তী এক জঙ্গলের ভিতরে শিবিরে অবস্থান নেয়। সেখানেই ইটের তৈরি সিংহাসন বানিয়ে আকবরকে স¤্রাট হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়। অত:পর বিশ^স্ত সেনাপতি বৈরাম খাঁর বিচক্ষনতায় আকবর পুনরায় ১৩ বছর বয়সে রাজকীয় আড়ম্বরে দিল্লির মসনদে আসিন হন।
সাহসী যোদ্ধা, সাম্রাজ্য বিস্তার, সুদক্ষ শাসন কার্য্য, সাংস্কৃতির প্রসার, সাধারণ মানুষের জীবন মান উন্নয়নে বৈচিত্রময় রাজ্য শাসনে ৩০ বছর অতিবাহিত হলে সাম্রাজ্য বিভিন্ন অঞ্চলে খাজনা আদায় ও দরবারের কার্য পরিচালনায় সন তারিখের হিসাব নিয়ে বিদ্ঘুটে জটিলতা সৃষ্টি হয়। কারণ তখন ভারত বর্ষে বহু প্রকার সন তারিখের প্রচলন ছিল, যেমন: ভারত সন, বিক্রম সন, শালীবাহন সন, জালালী সন, গুপ্তাব্দ, লক্ষন সন ইত্যাদি এদের অধিকাংশই ছিল চন্দ্র সন। এক পূর্ণীমা থেকে পরবর্তী আমাবস্যা অথবা এক অমাবস্যা থেকে পরবর্তী পূর্ণিমা পর্যন্ত সময়ের নাম চন্দ্র মাস। চন্দ্রের বর্ষ পরিক্রমার হিসাব অনুযায়ী চন্দ্র সন গণনা করা হয়। সাধাণত ৩৫৪ দিন ৯ ঘন্টায় এক চন্দ্র বৎসর হয়।
আরবী হিজরী সনও এইরূপ একটি চন্দ্র সন। হযরত মোহাম্মদ (স.) কুরাইশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিজ জন্মভূমি মক্কা নগরী ছেড়ে ৪৫০ মাইল দূরবর্তী মদিনায় গিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য অবস্থান নেন। মক্কা থেকে মদীনা অভিমুখে এই অভিযাত্রাকে আরবী ভাষায় হিযরত বলা হয়ে থাকে। নবীর হিজরতের স্মৃতি রক্ষার্থে এই সন প্রচলন হওয়াতে তাকে হিজরী সন বা আরবী সন বলা হয়ে থাকে। অন্য দিকে সূর্যের রাশী চক্র এক বছরে অতিক্রমের সময় লাগে ৩৬৫.৬ ঘন্টা অর্থাৎ চন্দ্র সন থেকে সূর্য সন ১১ দিন বেশী।
মোঘল আমলে রাজ দরবারে হিজরী সনের প্রচলন ছিল। এই হিজরী সন অনুযায়ী কোন নির্দিষ্ট দিনে প্রজাদের খাজনা পরিশোধের দিন ধার্য্য করে দিলে প্রতি বারই এই সন সরে যেতে থাকে, অথচ ফসল তোলার সময় বা প্রাকৃতিক ঋতু সরে যায় না। যার কারণে প্রজাদের খাজনা আদায়ে ও দরবারে কার্য পরিচালনার দিন তারিখ নিয়ে বিভ্রাট সৃষ্টি হয়। এই জটিলতা দূরিকরণে সম্রাট আকবরের রত্ম সভা সদস্য ফতেহ্উল্লাহ কে হিজরী সন, ফসলী মৌসুম এবং ভারতে প্রচলিত নানা প্রকার চন্দ্র সনের সমন্বয়ে একটি সৌর সন তৈরির নির্দেশনা দেয়া হয়।
আইন-ই-আকবরী থেকে জানা যায়, সম্রাট এমন একটি ত্রুটিমুক্ত ও বিজ্ঞান সম্মত সৌর সনের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্যই একটি সাবলিল সুন্দর সন হতে পারে।
স¤্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনের হিজরী সন ছিল ৯৬৩ সন। এই হিজরী সনকেই সৌর সনে রূপান্তরিত করে বাংলা সনের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। যার কারণে বাংলা সন পর্যায়ক্রমে গণনা শুরু হয় ৯৬৪, ৯৬৫… এভাবে আজ ২০২৬ সন। বাংলা সনের বৈশিষ্ট এই যে, এখানে সৌর সন ও চন্দ্র সন সম্মিলিত হয়ে এক অভিনব সনের জন্ম দিয়েছে। সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনের কাল ১৫৫৬ ইংরেজী সন চলতি ২০২৬ থেকে বাদ দিলে ২০২৬-১৫৫৭=৪৭০ বছর আর এর সঙ্গে হিজরী ৯৬৩ যোগ দিলে ৯৬৩+৪৭০=১৪৩৩ বাংলা সন। আরেকটি ব্যাপার হলো ইংরেজীতে সৌর সন ১৪ এপ্রিল এর সঙ্গে বাংলা সনের শুরু ১লা বৈশাখ এমন ভাবে সমন্বয় করা হয় যে, বাংলা সন ঘুরে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল ই বাংলা ১লা বৈশাখের মিল ঘটবে। নববর্ষ অনুষ্ঠানে আমাদের সকলের জন্য নতুন দিন বয়ে নিয়ে আসুক, দূর হউক হিংসা-বিদ্বেষ, শুভ নববর্ষ-১৪৩৩
লেখক-এড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল
বিশিষ্ট রাজনীতিক ও আইনজীবী