লিবিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে পরিবারের কাছে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে ৫০ লাখ টাকারও বেশ আন্তর্জাতিক চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ জেলা। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন আদালতে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— অপহরণ চক্রের অন্যতম মূলহোতা উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) এবং মুক্তিপণের টাকা গ্রহণকারী মর্জিনা বেগম (৩৯)। পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি দল তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় ফতুল্লা থানার সাইনবোর্ড এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে।
মামলার নথি ও পিবিআই সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার বিজয়নগর গ্রামের বাসিন্দা মো. ইদ্রিস আলী (৫৪) দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা এলাকায় বসবাস করে আসছিলেন। গত ১৭ মার্চ সন্ধ্যায় বাসার সামনে ৩টি গাড়িতে করে অস্ত্রধারী উত্তম সরকার ওরফে সুমন, আসলাম, আরিফ মোল্লা, রাজু মিয়াসহ অজ্ঞাত ৫–৬ জন সন্ত্রাসী তার পথরোধ করে। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এবং চোখ বেঁধে তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। এ সময় তার পাসপোর্ট, নগদ টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
অপহরণের দুই দিন পর থেকে শুরু হয় পৈশাচিক নির্যাতন। ইদ্রিস আলীকে মারধরের দৃশ্য ইমো ভিডিও কলের মাধ্যমে দেশে অবস্থানরত তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমকে দেখানো হয় এবং ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়; অন্যথায় মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। স্বামীর জীবন রক্ষার্থে স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে ফাতেমা বেগম ভুলতা গাউছিয়া ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে আসামিদের দেওয়া একাউন্টে ২০ লাখ টাকা পাঠান।
প্রথম দফায় টাকা পাওয়ার পরও সন্ত্রাসীরা থামেনি। তারা পুনরায় লোহার রড দিয়ে ইদ্রিস আলীর ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়, যার ফলে তার ডান পা ভেঙে যায়। দিনে মাত্র একটি শুকনো রুটি ও এক বোতল পানি দিয়ে তাকে অনাহারে-অর্ধাহারে রাখা হতো। পরবর্তীতে আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হলে নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগীর স্ত্রী ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ২৮ লাখ টাকা এবং বিকাশের মাধ্যমে আড়াই লাখ টাকা পাঠান। এভাবে সর্বমোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।
টাকা আদায়ের পর দীর্ঘ ১ মাস ১৪ দিন বন্দি রেখে গত ৮ এপ্রিল রাতে ত্রিপোলির মদিনা এলাকায় রাস্তার পাশে ইদ্রিস আলীকে ফেলে যায় অপহরণকারীরা। পরবর্তীতে লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় গত ২২ জুলাই দেশে ফিরে আসেন তিনি।
দেশে ফিরে ভুক্তভোগী ইদ্রিস আলী সোনারগাঁও থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ জেলা পিবিআই স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে এবং এসআই মফিজুল ইসলামকে তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়।
পিবিআই প্রধান অ্যাডিশনাল আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের দিক-নির্দেশনায় এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ (বিপিএম)-এর তত্ত্বাবধানে সাইনবোর্ড এলাকা থেকে উত্তম সরকার ও মর্জিনা বেগমকে গ্রেফতার করা হয়।
আদালতে সোপর্দ করে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন জানালে বিজ্ঞ আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে আজ ২৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের আদালতে হাজির করা হলে আসামী মর্জিনা বেগম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
পিবিআই জানায়, লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রটি সাধারণ বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেট করে অপহরণ ও মুক্তিপণ বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। চক্রের বাকি সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।