বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতিতে ত্যাগ, নির্যাতন ও দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার যে ক’জন নেতার নাম নারায়ণগঞ্জে বারবার উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এডভোকেট আবু আল ইউছুফ খান টিপু। দীর্ঘ ১৭ বছরের বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে রাজপথে তার আপসহীন ভূমিকা নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং দলের সরকার গঠনের পর, এই পরীক্ষিত ও নিবেদিতপ্রাণ নেতার যথাযথ মূল্যায়নের দাবি জোরালো হচ্ছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে।
রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথচলায় এডভোকেট টিপুকে চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে। বিগত আওয়ামী শাসনামলে নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ‘গডফাদার’দের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। এর জের ধরে বারবার হামলা, হয়রানিমূলক মামলা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তাকে। গত ১৭ বছরে তার বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক গায়েবি ও মিথ্যা সাজানো মামলা দায়ের করা হয় এবং একাধিকবার কারাবরণ করেন তিনি। ফ্যাসিস্ট সরকার শেষ অবধি বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় ৩০ টি অধিক হত্যা মামলায় জড়ানো হয়। শেখ হাসিনার পতন না হলে তাকে চরম পরিনতি ভোগ করতে হতো।
বিশেষ করে, ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় লঞ্চ টার্মিনালের সামনে অবরোধের সমর্থনে মিছিল বের করলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাজপথে তার একলা লড়াই করার সাহসী ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু ব্যক্তিগতভাবেই নয়, বরং দলের সংগ্রামী ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
১৯৮৪ সাল থেকে ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি হওয়া এড.টিপু ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি, জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি ও পরে তিনি মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনীতিতে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা ও তৃণমূলের সাথে গভীর সম্পৃক্ততার কারণে বিএনপির পরীক্ষিত নেতাদের কাতারে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি কেবল দলীয় কর্মসূচিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি রাজপথে নেমে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে বেগবান করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি ৫ আগষ্টের পর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনীতি ও অরাজকতা রোধে নারায়ণগঞ্জের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিটি মন্দির, অফিস, আদালত ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে দৃঢ়তার সঙ্গে কর্মী সমর্থকদের নিয়ে মোকাবেলা করছেন।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিটি রাজনৈতিক কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করেছেন তিনি। দলের কৌশল ও নীতিনির্ধারণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে তার স্পষ্টভাষী বক্তব্য এবং অটল অবস্থান কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচিত। সাম্প্রতিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিলেও দল যাকে সমর্থন করেছে তার পক্ষে কাজ করছেন। সদর ও বন্দরের এই আসনের দলের জয় নিশ্চিত করতে তিনি ও তার কর্মী-সমর্থকদের প্রশংসনীয় ও বিশ্বস্ত ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকার গঠন করায় এডভোকেট টিপুর কর্মী-সমর্থকদের মাঝে বিপুল আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক অবদানের জন্য টিপুর মতো নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা হলে তা দলের জন্য অকল্যাণকর হতে পারে। পরীক্ষিত নেতাদের অবমূল্যায়ন তৃণমূলে হতাশার জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
সমর্থকদের মতে, দলের দুঃসময়ে যারা হাল ধরেছিলেন, তাদের যথাযথ সম্মান ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকা নিশ্চিত করা হলে দলের ঐক্য ও শক্তি আরও সুসংহত হবে।
ত্যাগের এক দীর্ঘ ইতিহাস আর তৃণমূলের অকৃত্রিম ভালোবাসাকে সঙ্গী করে এডভোকেট আবু আল ইউছুফ খান টিপু নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এক অপরিহার্য নাম। আগামী দিনে দল কীভাবে তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পুঁজিকে কাজে লাগায়, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষায় নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহল।