দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ ঢাকবাসীর অন্যতম প্রধান দুর্ভোগের নাম ‘হকার সমস্যা’। মেয়র, সংসদ সদস্য থেকে শুরু the করে সচেতন নাগরিক ও সাংবাদিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাও বারবার এই চেনা জটের কাছে হার মেনেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, অথচ নারায়ণগঞ্জ নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং হকারদের স্থায়ী পুনর্বাসন যেন কোনো আমলেই আলোর মুখ দেখেনি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে একাধিকবার ফুটপাত উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেসব উদ্যোগ সফল হওয়ার বদলে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী হকার উচ্ছেদে মাঠে নামলে সংঘাতের সৃষ্টি হয়, যাতে মেয়র ও সাংবাদিকসহ অসংখ্য মানুষ আহত হন। সংঘাতে ঘটনার মামলা হলেও অধরা থেকেই যায় স্থায়ী সমাধান।
নগরবাসীর মতে, তৎকালীন সময়ে উচ্ছেদ কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন স্থানীয় সাবেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। অভিযোগ রয়েছে, ফুটপাত থেকে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিশাল অঙ্কের চাঁদা আদায় এবং দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হকারদের জনবল হিসেবে ব্যবহারের স্বার্থেই তিনি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তখনকার মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির আহমেদ খলিল ও যুবলীগ সভাপতি শাহাদাত হোসেন ভুঁইয়া সাজুর মতো নেতারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হকারদের নিয়ন্ত্রণ ও বহাল রাখতে ভূমিকা রাখেন।
চব্বিশের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ওসমান সাম্রাজ্যের পতনের পর নগরবাসী ভেবেছিলেন, এবার হয়তো ফুটপাত মুক্ত হবে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। খলিল কিংবা সাজুর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গা-ঢাকা দিলেও ফুটपाতের চিত্র বদলায়নি। নগরবাসীর অভিযোগ, কেবল ক্ষমতার চেহারা পরিবর্তন হয়েছে, মূল ব্যবস্থা একই রয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর নতুন একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী অংশ একইভাবে চাঁদা ও হকার নিয়ন্ত্রণে মেতে ওঠায় দীর্ঘদিনের এই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
তবে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব নেওয়ার পর হকার উচ্ছেদে এক অভূতপূর্ব সাড়া জাগানো উদ্যোগ নেন। তিনি দলমত নির্বিশেষে পুরো নগরবাসীকে এক ছাদের নিচে এনে দাঁড় করান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ নাগরিকরা ঐক্যবদ্ধ হন। একযোগে পুরো শহরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। তবে সর্বস্তরের মানুষের এমন অভূতপূর্ব সমর্থন পাওয়ার পরও উদ্যোগটি বেশিদূর এগোয়নি; অল্প কিছুদিনের মধ্যে গতি হারিয়ে তা থেমে যায়। পরবর্তীতে মহানগর বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সাথে নিয়ে প্রশাসক পুনরায় উদ্যোগী হলেও বাস্তবায়ন আটকে থাকে।
নগরবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, সাখাওয়াত হোসেন খান যদি সেই সর্বদলীয় সমর্থনের সুযোগটি পুরোপুরিভাবে কাজে লাগাতে পারতেন, তবে নারায়ণগঞ্জ থেকে স্থায়ীভাবে হকার উচ্ছেদ সম্ভব ছিল। বিপুল জনপ্রিয় সমর্থন থাকা সত্ত্বেও উদ্যোগটি থেকে পিছিয়ে আসা অত্যন্ত বিস্ময়কর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসক যদি মনে করে থাকেন হকারদের ভোট ব্যাংকের কথা চিন্তা করে পিছিয়ে আসা লাভজনক, তবে সেটি ভুল হিসাব। নারায়ণগঞ্জে সাধারণ নগরবাসীর সংখ্যা হকারদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এই সাহসী উদ্যোগটি সফল করতে পারলে তিনি নগরবাসীর একচেটিয়া আস্থা ও সমর্থন পেতেন, যা যেকোনো জনপ্রতিনিধির জন্য সবচেয়ে বড় মূলধন হতে পারত।
ফুটপাত পুরোপুরি খালি করার অংশ হিসেবে হকারদের স্থানান্তরের একটি পরিকল্পনা হাতে নেয় সিটি করপোরেশন। চাষাঢ়া রেললাইনের কোল ঘেঁষে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তাটিকে অস্থায়ী পুনর্বাসন অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সিটি করপোরেশন উক্ত রাস্তাটি সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে হকারদের নাম নিবন্ধনের কাজ শুরু করে। তবে অভিযোগ উঠেছে, মাত্র ২-৪ দিন হকারদের কাছে গিয়ে ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি ও তথ্য সংগ্রহের পর সিটি করপোরেশনের সেই গণনাকারীদের আর দেখা মেলেনি।
এদিকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নিয়ে হকারদের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক অসন্তোষ। একাধিক হকার জানান, যেখানে স্থানান্তরের কথা বলা হচ্ছে সেখানে সাধারণ ক্রেতারা কেনাকাটা করতে যেতে চাইবে না। মূল মার্কেটের সামনে দোকান থাকায় যাতায়াতের পথে ক্রেতারা পণ্য দেখে কেনেন, অথচ নতুন নির্দিষ্ট স্থানে তাদের বেচাকেনা একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সিটি করপোরেশন যা-ই বলুক না কেন, তারা সেখানে যেতে ইচ্ছুক নন।
হকার স্থানান্তর প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পুনর্বাসনের কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সামান্য কিছু আনুষ্ঠানিকতা ও কারিগরি কাজ বাকি থাকার কারণেই মূল প্রক্রিয়াটি ঝুলে আছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে বিষয়টি তদারকি করছেন এবং এখানে গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। খুব দ্রুত বাকি কাজ সম্পন্ন করে হকারদের নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করা হবে এবং নগরবাসীকে ফুটপাত চলাচলের উপযোগী করে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার ছক আঁকা হলেও বাস্তবে নারায়ণ్গঞ্জের ফুটপাত এখনো হকারদের দখলেই রয়েছে। আশ্বাস আর বাস্তবে রূপ দেওয়ার মাঝের এই দূরত্ব কবে ঘুচবে—সেই প্রশ্নই এখন নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের সচেতন নগরবাসীর।