নারায়ণগঞ্জের বন্দরে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়েছে ‘বন্দর গণহত্যা দিবস’। বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে বন্দর সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে অবস্থিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্তর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দীনা তাজরিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি। আরও বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা কাজী নাসির, মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ খান, সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী শংকর রায়, জিয়াউর ইসলাম কাজল ও প্রদীপ ঘোষ বাবু।
আলোচনায় অংশ নেন নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক দীপু, সিপিবির শহর কমিটির সভাপতি আবদুল হাই শরীফ, শহীদ পরিবারের সন্তান ফাহমিদা Azad, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের জেলা সভাপতি প্রদীপ সরকার এবং সামাজিক সংগঠন সমমনার উপদেষ্টা দুলাল সাহা প্রমুখ।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে রফিউর রাব্বি বলেন, “আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার প্রকৃত তথ্য ও চিত্র এখনো মূল ইতিহাসের সাথে যথাযথভাবে যুক্ত হতে না পারাটা এক চরম ব্যর্থতা। বন্দর গণহত্যা আমাদের ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়।”
তিনি একাত্তরের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল ভোররাতে স্থানীয় বিহারিদের সহায়তায় পাক হানাদার বাহিনী দুই দিক থেকে বন্দরে প্রবেশ করে। তারা বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে জড়ো করে। সেখানে ৫৮ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং পরে তাদের লাশ গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রাতেই স্থানীয়রা ৫৪ জন শহীদকে এই বধ্যভূমিতে গণকবর দেন। নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত ১০৯টি গণহত্যার মধ্যে এটি অন্যতম।” তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের যথাযথ ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে হবে।
মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ খান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “বন্দর গণহত্যার এই দিনটি অত্যন্ত অবহেলায় পালিত হয়। এই আয়োজনে সরকারি প্রশাসনের কোনো দায়বদ্ধতা দেখা যায় না।” তিনি এই দিবসটি সম্মিলিতভাবে পালনের দাবি জানান।
আলোচনায় বক্তারা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপপ্রয়াসের তীব্র নিন্দা জানান এবং এ বিষয়ে সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
আলোচনা সভার আগে শহীদ বেদিতে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায় নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট, শহীদ পরিবার, জেলা সিপিবি, জেলা বাসদ, সমমনা, উন্মেষ সাংস্কৃতিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভলান্টিয়ার এসোসিয়েশন। সবশেষে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।